সবুজ বিপ্লব কাকে বলে, সুফল-কুফল : Green Revolution in Bengali

সবুজ বিপ্লব কাকে বলে ? sabuj biblab | সবুজ বিপ্লব কবে হয়েছিল - ইত্যাদি বিষয় সম্পকে বিস্তারিত আলোচনা ।

সবুজ বিপ্লব কাকে বলে ? 

সংজ্ঞা: স্বাধীনতার পরবর্তীকালে 1960 দশক থেকে ভারতের কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আসে । চিরাচরিত কৃষিপদ্ধতির পরিবর্তে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি , সার ও উচ্চফলনশীল বীজের সাহায্যে যে নতুন কৃষিপদ্ধতি গড়ে তোলা হয় তাকে সবুজ বিপ্লব বলে । 

1960-61 সালে নরম্যান বোরলগের নেতৃত্বে Intensive Agricultural District Programme ( IADP ) এবং High - Yielding Varieties Programme ( HYVP ) এর মাধ্যমে এই সবুজ বিপ্লব শুরু হয় ।

সবুজ বিপ্লবের ফলাফল হিসাবে 1966 সালে পাঞ্জাব , হরিয়ানা , দিছি রাজস্থান , পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে লাক্ষা রাজ্যে , সোনাবা 64 , কলাপ ইত্যাদি উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করে বছরে দুই বা তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব হয়েছে । 

সবুজ বিপ্লবের সুফল :

সবুজ বিপ্লবের সুফল দিকগুলি নিচে বলা হলো -

  1. মূলত প্রধান দুই খাদ্যশস্য ধান ও গমের উৎপাদন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায় । ধানের উৎপাদন 1000 সালে 36 মিলিয়ন টন ছিল । 2011-12 সালে তা বেড়ে 105 : 31 মিলিয়ন টন হয়েছে । তবে সবুজ বিপ্লবের ক্ষেত্রে ভুট্টা , বালি , বাণী , জোয়ারের মতো শস্যের উৎপাদন খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি । ধান ও গমের ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল বা HYV বীজ ব্যবহার করা হয় । 

  2. সবুজ বিপ্লবের ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নানা বাণিজ্যিক ফসল তুলা , পাট , চা , কথি , তৈলবীজ, আগের উৎপাদন।

  3. সবুজ বিপ্লবের পরবর্তীকালে ভারত খাদ্যশস্য উৎপাদনে অনেকটাই স্বনির্ভর হয় । 1960-61 সালে ভারতবর্ষে খাদ্যশস্যের যা চাহিদা ছিল তার 16 % বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত । কিন্তু 2008-09 সালে মাত্র ৪ % খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে । 

  4. সবুজ বিপ্লবের ফলে বহু মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে । রোজগার বৃদ্ধি পায়ছে । নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিজ ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে । 1960 দশকের পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে সবুজ বিপ্লবের প্রভাবে গম উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ধান , ভুট্টা ও আলুর উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে । এছাড়া বহু ফসলি ( Multiple Cropping ) ব্যবস্থা চালু হওয়াতে বহু মানুষ সারাবছর ধরে কৃষিক্ষেত্রে কাজ পেয়ে থাকে ।

  5. আধুনিক কৃষিব্যবস্থা প্রচলন হওয়াতে প্রযুক্তি পরোক্ষভাবে কৃষিক্ষেত্র ও শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে মেলবদন তৈরি করেছে । কৃষিজ ফসলের উৎপাদন ধারা বজায় রাখার জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামালের অভাব হয় না , ফলে বহু কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠেছে । এর ফলে শিল্পক্ষেত্রেও নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে । 

সবুজ বিপ্লবের কুফল :

সবুজ বিপ্লবের সুফলের পাশাপাশি বেশ কিছু কুফল বা দুর্বলতাও রয়েছে সেগুলি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো -

  •  এই আধুনিক কৃষিব্যবস্থা মূলত বাজার - নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা । ফসলের মূল্য নির্ধারিত হয় বাজার দরের ওপর । বাঙরে দরের তারতম্যের জন্য সর্বত্র উৎপাদন ব্যবস্থা লাভজনক হয় না । 

  • ভারতের কৃষি ব্যবস্থা এখনও মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল । সেচ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ার জন্য ভারতের বড়ো নদীগুলিতে প্রতি বছর বন্যা হয় । আবার উচ্চ ফলনশীল বীজের জন্য প্রচুর তলের দরকার হয় । তাই বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ে এই ধরনের ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না , ফলে দেশের সর্বত্র দুই বা তিনবার ফসল পাওয়া যাচ্ছে না । 

  • সবুজ বিপ্লবের মুল ভোগ করতে হলে মূলধনের স্লোগান থাকা একান্ত প্রয়োজন । মূলত ADP এবং HYVP - 3 আয়াতে এই পরিকল্পনাটি শুরু হয় । ফলে বীজ , সার , কীটনাশক ও জলের জোগন অব্যাহত রাখার জন্য প্রচুর মূলধনের দরকার । ভারতের ব্যাংক ব্যবস্থায় নানা সমস্যার জন্য নিম্ন ও মধ্যম শ্রেণির কৃষকরা এই বিপুল অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না । আবার ভারতের 81 মিলিয়ন কৃষকের মধ্যে মাত্র ৪ % বড়ো মাপের কৃষক । তাই সবুজ বিপ্লবের সুফল দেশের সর্বত্র দেখা যায় না । 

  • ভারতের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশই কৃষক । কিন্তু নিজস্ব জমি না থাকায় এদের ভাগচাষী হয়ে বা বীজ নিয়ে চাষ করতে হয় । ফলে মূলধনের জোগান থাকে না , যা ফসল উৎপাদনকে ব্যাহত করে । শিক্ষাক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগান দিতে পারে না । তাই কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলিতে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হয় । 

  • হরিয়ানা , পাঞ্জাব ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের যে সব জেলার সবুজ বিপ্লব হয়েছিল সেসব জেলার গ্রামাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন হয় । গ্রামের যেসব সমৃদ্ধশালী কৃষকরা সবুদ্ধ বিপ্লবের পদ্ধতি গ্রহণ করে তারা আরও বিত্তশালী হয়ে ওঠে । সামাজিক জীবনযাত্রার মানের উন্নতি ঘটে । গ্রামের মধ্যে আর্থিকভাবে উন্নত ও অনুন্নত কৃষকশ্রেণির মধ্যে আর্থিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে । 

  • সবুজ বিপ্লবের ফলে যে আধুনিক প্রযুক্তি কৃষিতে ব্যবহৃত হয় তা চালতে প্রয়োজন ছিল সঠিক দক্ষ কৃষক শ্রমিকের । ভারতে উপযুক্ত দক্ষ ও শিক্ষিত শ্রমিকের একান্ত অভাব আছে । 

  • সবুজ বিপ্লবকে সফল করার জন্য কৃত্রিম রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় । প্রথম পর্যায়ে উৎপাদন বৃদ্ধিও পায় । কিন্তু এত বছর পর ওই অঞ্চলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে । রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে মুক্তিকার উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে । ফলে যখন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে । এর পাশাপাশি ওই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ।

সবুজ বিপ্লবের ফলে যে সমস্ত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলির সমাধানের উপায় হল- শিক্ষিত কৃষককূল অর্থাৎ কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা , সঠিক সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা । উন্নত ব্যাঙ্কিং ব্যবসা চ রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি করা । করা যার সাহায্যে কৃৎকরা সহজে মূলধনের সুবিধা পায় । কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে সঠিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোল ।

দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব : প্রথম সবুজ বিপ্লব 1900 - এর দশকে ভারতের উত্তর - পশ্চিমাংশে শুরু হলেও ধীরে ধীরে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে । এই প্রযুক্তি গ্রহণ করে 2006 সালে দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব ঘটে । মূলত বিহার , উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতের রাজনগুলিতে জোয়ার , বাজরা , ধান , আলুর উৎপাদন বৃদ্ধি পায় । স্বামীনাখনের নেতৃত্বে এই পর্যায়ের বিপ্লবটি পরিচালিত হয়।


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post